চা সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনে এক সময় কানন দেবীর মতো কিংবদন্তী অভিনেত্রীও অংশ নিয়েছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্রের প্রবাদপ্রতিম অভিনেতা পাহাড়ী সান্যালের সহধর্মিনী মীরা সান্যালও চায়ের বিজ্ঞাপন করেছেন। এর পাশাপাশি দেখা গেছে লীলা দেশেকেও। জুম্মা খান ও জুনা সায়গল প্রমুখ টি বোর্ড প্রচারিত চায়ের বিজ্ঞাপনে অংশ নিয়েছিলেন। আশির দশকে শোভা দে বেশ কয়েকটি চায়ের বিজ্ঞাপন করেন। টি ভ্যালির বিজ্ঞাপনে একসময় অমিতাভ বচ্চনকেও দেখা গেছে।
ভারতীয় চায়ের বিজ্ঞাপনের বৈচিত্র অবাক করে!

একদিকে দ্য মেট্রোপোলিটন কোম্পানির চায়ের বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হয়েছে মুঘল মিনিয়েচার। আবার অন্যদিকে ‘সিলন টি’ -এর বিজ্ঞাপনে শ্রীলংকার মানচিত্রের ওপর চা পাতার ছবি দেওয়া বিজ্ঞাপনটি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ঠিক এরকমই আর একটি বিজ্ঞাপন দেখতে পেলাম যেখানে ইন্ডিয়ান টির বিজ্ঞাপনেও শ্রীলংকার মত অবিভক্ত ভারতের মানচিত্র ব্যবহার করা হয়েছে।

অন্যদিকে পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত ‘ইত্তেহাদ পত্রিকা’-র পাতায় প্রকাশ পাওয়া একটি চায়ের বিজ্ঞাপন দেখে জানা গেল যে এক সময়ে পাকিস্তানী চায়ের দুটি বিপণন কেন্দ্র ছিল খোদ কলকাতার খিদিরপুর আর চাঁদনী মার্কেটে।

১০০ শতাংশ স্বদেশী চায়ের বিজ্ঞাপনগুলিও অভিনব। তার মধ্যে একটি বিজ্ঞাপনে দেখা যাচ্ছে চরকার সামনে বসে এক রমণী, হাতে চায়ের কাপ। এই ধরনের আরও সাতটি বিজ্ঞাপনেও রয়েছে বৈচিত্র।

১৯৪৩ সালে প্রকাশিত ইন্ডিয়ান টি -এর এক বর্ষপঞ্জীতে রয়েছে চিত্রকলার ছোঁয়া।
প্রথমেই লিখেছি যে চা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিজ্ঞাপন, তা সে বাণিজ্যিক সংস্থার হোক বা টি বোর্ডের, সবগুলিইর মধ্যেই রয়েছে শিল্পের স্পর্শ এবং নান্দনিক চিন্তা-ভাবনা।
সাগরপারে আবার চায়ের বিজ্ঞাপন নিয়ে অন্যরকম ভাবনা দেখা গেছে। সিগারেট কার্ড, চকলেট কার্ডের সম্পর্কে জানা থাকলেও টি কার্ডের বিষয়ে তেমন কিছু জানা ছিল না এবং কোনও তথ্যও হাতে আসেনি। সম্প্রতি একগুচ্ছ টি কার্ড হাতে আসায় চায়ের বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে এক নতুন দিক যেন আবিষ্কৃত হল। এইসব টি কার্ডগুলো কিন্তু প্রকাশ পেয়েছে ব্রুক বন্ড টি কোম্পানির থেকে।
বিদেশে ব্রুক বন্ডের চা এবং টি ব্যাগের ভেতরে সংগ্রহযোগ্য এই ধরনের টি কার্ডগুলো বিতরণ করা হত। বিশ্বের বিখ্যাত সব ব্যক্তিত্বদের ছবি থাকত সেইসব কার্ডের একদিকে আর অন্যদিকে থাকত সেইসব ব্যক্তির সম্পর্কে তথ্য এবং সংক্ষিপ্ত পরিচিতি। Famous People শীর্ষক এই কার্ডেগুলো সংগ্রহ করে অনেকে ছবির অ্যালবাম তৈরি করত। সেই সময়ে চা ক্রেতাদের কাছে এই ধরনের টি কার্ডের মূল্য ছিল অপরিসীম।

যে সব ব্যক্তিত্বদের ছবি কার্ডের ওপরে ছাপা হত, তাঁদের মধ্যে ছিলেন বার্নার্ড শ, উইন্সটন চার্চচিল, লর্ড মাউন্টবাটেন, রবার্ট ডারউইন, স্যার লোরেন্স অলিভিয়ের, ষষ্ঠ জর্জ ও রাণী এলিজাবেথ দ্বিতীয়, লর্ড টেনিসন, চার্লস স্পেন্সর চাপলিন, চার্লস ডিকেন্স, ডেভিড লিভিংস্টন, সপ্তম এডওয়ার্ড, স্যার স্টানলেই ম্যাথিউ, লর্ড লিস্টার, স্যার আলফ্রেড রামপসে প্রমুখ।

বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের ছবি ছাড়া আর অন্য কোনও বিষয় নিয়ে টি কার্ড প্রকাশ করা হয়েছিল কিনা জানা নেই কিন্তু একটা জনপ্রিয় পানীয়কে জনসাধারণের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কতই না অভিনব সব পন্থা অবলম্বন করা হত দেশে-বিদেশে!
ছোটবেলায় দেখেছি শহরের দেয়ালে চায়ের বিজ্ঞাপন বিষয়ক এনামেল বোর্ড। সেইসব বোর্ডের ওপরে থাকত হাতে আঁকা চা বাগানের ছবি এবং চা প্রস্তুতকারক সংস্থার নাম।

কালের গর্ভে সেসবও আজ হারিয়ে গেছে। তার জায়গায় নতুনভাবে নতুন শৈলীতে বর্তমানে চায়ের বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হচ্ছে। মনে পড়ে তপন সিংহ পরিচালিত, ‘গল্প হলেও সত্যি’ ছবির কথা? যেখানে একান্নবর্তী পরিবারের বড়খোকা বলছে, ‘অপিসের চা আর মুখে রোছেনা, বাড়িতে যা চা খাই, এলে একদিন বুঝবি। মনে হবে এক কাপ গরম জল কেউ ধরল চা গাছের নীচে আর অমনি ওপর থেকে পড়ল দুটি পাতা।’ এমন চা পাগল বাঙালি অপিস ফেরতা ভাল এবং নামকরা সব চায়ের দোকানে ভিড় করত আবার কয়েকজন পাড়ার মোড়ে রেডিমেড চায় চুমুক দিয়ে সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে বাড়িমুখো হত।

কালে কালে চায়ের বিজ্ঞাপনে নানান বিবর্তন ঘটেছে এবং আজও ঘটছে। হাল্কা রঙের কাগজ দিয়ে তৈরি ঠোঙাতে চা প্যাক করে দেবার কথা বোধহয় আমরা ভুলতে বসেছি! এখন তো গ্রিন টি, আয়ুর্বেদিক টি, জুঁই ফুলের গন্ধযুক্ত চায়ের রমরমা চারিদিকে। আর সেইসব চায়ের স্মার্ট প্যাকিং দেখলে তাক লেগে যায়।

এমনকি বাহারি সব কৌটোতে শহরের নানান কাফেতে বিক্রি হচ্ছে ফার্স্ট ফ্লাশ, সেকেন্ড ফ্লাশ ইত্যাদি অভিজাত চা। সাবেক কলকাতার মধ্যবিত্ত বাড়ির স্টোভে তৈরি করা চায়ের গন্ধকে এখন মনে হয় গত জন্মের কথা।

